সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৭

চাওয়া হবে হাথুরুর জবাবদিহি?


তাহলে চূড়ান্ত রায় দিয়ে দিয়েছেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে! নাসির হোসেনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা নেই। মুমিনুল হকের যোগ্যতা নেই টেস্টের বাইরে কিছু খেলার। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ চলাকালেই নাকি কোচ দলের মধ্যে এই মত প্রকাশ করেছেন।
সেটির প্রতিফলনও দেখা গেছে। পুরো সফরে দলের সঙ্গে রেখে দিলেও টেস্ট সিরিজের পর মুমিনুলকে আর কোনো কিছুর জন্যই বিবেচনা করা হয়নি। আর নাসির তো ওয়ানডেতে সুযোগ পেয়েও নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। একজন কোচ এ রকম সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। তাঁর মনে হতেই পারে অমুক ক্রিকেটারকে দিয়ে হবে, তমুককে দিয়ে হবে না। কিন্তু এ রকম সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যদি সেই কোচ শুধু নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে থাকা নিকট অতীতটাই দেখেন, তাহলে তাঁর যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একজন ক্রিকেটার খারাপ সময়ে পড়লে তাঁর সমস্যা দূর না করে ‘অমুক চলে না’, ‘তমুক পারে না’ জাতীয় সিদ্ধান্ত দিয়ে দিতে বিদেশি কোচ লাগে না। এ রকম ‘ক্রিকেট বোদ্ধা’ বাংলাদেশে ১৬ কোটি আছে।
হাথুরু বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগেও নাসির, মুমিনুল কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং সেগুলোতে ভালোও করেছেন। পরিসংখ্যানপ্রিয় হাথুরুসিংহে তো পারেন সেই পাতাগুলোও ওলটাতে। একজন খেলোয়াড়ের খারাপ সময় গেলে কোচেরই দায়িত্ব তাঁকে ফর্ম ফিরে পেতে সাহায্য করা। হাথুরুসিংহে কি তা করছেন? দলের অন্দরমহল থেকে অন্তত সে রকম কোনো খবর নেই। বাজে সময়ের মধ্যে থাকা ক্রিকেটারদের সঙ্গে বরং তাঁর রূঢ় আচরণেরই অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। সে জন্য অপমানিত হওয়ার ভয়েও অনেক খেলোয়াড় কোচের সাহায্য চাইতে যান না।
আর যদি কোচ কাউকে সাহায্য করেও থাকেন তাহলে ওই খেলোয়াড়দের সমস্যা সমাধানে তাঁকে ব্যর্থই বলা যায়। নইলে সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা ছাড়া দলে এখনো নির্ভর করার মতো আর কেউ নেই কেন? এখন হাথুরুসিংহে নিশ্চয়ই বলবেন না সাকিব-তামিম-মুশফিকেরা তাঁরই সৃষ্টি!
বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত প্রায় সাড়ে তিন বছরে হাথুরুসিংহের অবদান আসলে কিছুই নয়। তিনি যদি পারতেন সৌম্য সরকারের ব্যাটে ধারাবাহিকতা ফেরাতে, নাসিরকে আগের মতো নির্ভার ক্রিকেট খেলায় উজ্জীবিত করতে, টেস্ট সামর্থ্যের সঙ্গে মুমিনুলের ব্যাটিংয়ে ওয়ানডের মেজাজটাও আনতে (যেটা মুমিনুলের নেই বলেই মনে করেন হাথুরুসিংহে), তাহলেই বলা যেত বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য তিনি কিছু করেছেন। এই সাড়ে তিন বছর থেকে হাথুরুসিংহে এমন একটি উদাহরণ তুলে আনতে পারবেন না যেটা দিয়ে বাংলাদেশের সাফল্যে তাঁর অবদান প্রমাণিত হবে। এমন একজন ক্রিকেটার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যাঁকে দেখিয়ে কোচ দাবি করতে পারেন, ‘অমুকের সমস্যার সমাধান তো আমি করেছি।’
শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কান এই কোচের অনেক সিদ্ধান্তই মুখ বুজে মেনে নিচ্ছেন বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা। মুশফিকুর রহিমকে একটা স্থিতিশীল জায়গা থেকে নাড়িয়ে দেওয়া, মাশরাফি বিন মুর্তজাকে টি-টোয়েন্টি থেকে দূরে সরে যেতে চাপ সৃষ্টি করা এবং মুমিনুল হককে প্রায় অকেজো বানিয়ে ফেলা—বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত এগুলোই হাথুরুসিংহের দৃশ্যমান ছাপ।
অথচ কী বিস্ময়কর, এসব নিয়ে জবাবদিহির কোনো ধারই ধারেন না তিনি! দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে কোচ সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন শুধু প্রথম টেস্টের আগের দিন। এরপর সাংবাদিকেরা একাধিকবার চেয়েও কোচের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাননি। দল খারাপ খেলে, আর রাজ্যের প্রশ্নের মুখে পড়েন শুধু অধিনায়ক-খেলোয়াড়েরা। এ রকম সময়ে বড় কোচরা সাধারণত খেলোয়াড়দের তোপের মুখ থেকে বাঁচিয়ে নিজেরাই সংবাদ সম্মেলনের উত্তপ্ত চেয়ারে বসেন। অথচ দলের পারফরম্যান্স খারাপ দেখে হাথুরুসিংহে নিজে থাকছেন নিরাপদ দূরত্বে।
এই সিরিজে যখনই সংবাদ সম্মেলনে হাথুরুসিংহেকে চাওয়া হয়েছে, ম্যানেজার মিনহাজুল আবেদীন একটা কথাই বলেছেন, ‘কোচ কথা বলতে চান না।’ কিন্তু কোচের বিরুদ্ধে যে এত অভিযোগ, সেসব ব্যাপারে তাঁর ব্যাখ্যাও তো জানা উচিত। সেটা জানতেই প্রথম টি-টোয়েন্টির পর এই প্রতিবেদক হাথুরুসিংহের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। জবাবে হাথুরুসিংহে ধমকের সুরে বলে দেন, ম্যানেজার অনুমতি দিলেও তিনি সাক্ষাৎকার দেবেন না।
ধরে নেওয়া যাক এটাও কোচের একটা স্বাধীনতা। কিন্তু সংবাদমাধ্যম কোচকে কাছে না পেলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তো পাবে। দলের সাফল্যে কোচদের পিঠ চাপড়ে দিতে কার্পণ্য করে না বিসিবি। এবার তাহলে ব্যর্থতার জবাবদিহি নেবে না কেন? অবশ্য বিসিবি সেটা চাইলে বিপদে পড়তে পারেন খেলোয়াড়েরাও।
দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে খেলোয়াড়দের ব্যর্থতা নিয়ে নাকি এবার হাথুরু বেশ কড়া একটা রিপোর্টই জমা দিতে যাচ্ছেন বোর্ডের কাছে!

বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

কে এই ব্যাক্তি? পরিচয় জানলে আপনার সম্মানবোধ বেড়ে যাবে৷




"ছবির ছেলেটাকে চেনেন?
বলতে গেলে ঢাকার সবচেয়ে বড় লোক পরিবারের ছেলে ছিল। তখনকার দিনে যখন ১ম শ্রেণীর অফিসারের বেতন ছিল খুব বেশি হলে ৫০০-৬০০ টাকা, সে এলভিস প্রিসলির গান শোনার জন্য এক ধাক্কায় ১০০০ টাকার রেকর্ড কিনে আনতো। সিগারেট হিসেবে তখনকার সব থেকে দামী ব্র‍্যান্ড ছাড়া অন্যটা খেত না।  তাদের বাড়িতে হরিণ ছিল, সরোবরে সাঁতার কাটত ধবল রাজহাঁস, মশলার বাগান থেকে ভেসে আসত দারুচিনির গন্ধ(ডাকে পাখি খোলো আঁখি, এই গানটার শুটিং হয়েছিল তাদের বাড়িতে)। 
জ্বী হ্যা, আমি মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ এর কথা বলছি।

আজাদ ক্লাস সিক্সে পড়ে, সেন্ট গ্রেগরি। ১৯৬০ এর দশক। আজাদের বাবা আরেকটা বিয়ে করবেন। আজাদের মা বললেন, তুমি বিয়ে করবে না, যদি করো, আমি একমাত্র ছেলে আজাদকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব। আজাদের বাবা আরেকটা বিয়ে করলে আজাদের মা সাফিয়া তার বালকপুতের হাত ধরে ওই রাজপ্রাসাদ পরিত্যাগ করেন এবং একটা পর্ণকুটীরে আশ্রয় নেন। ছেলেকে লেখাপড়া শেখান। আজাদ ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করে।

তার বন্ধুরা যোগ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে, ফিরে এসেছে আগরতলা থেকে, ট্রেনিং নিয়ে। তার ঢাকায় গেরিলা অপারেশন করে। বন্ধুরা আজাদকে বলল, চল, আমাদের সাথে, অপারেশন করবি। তুই তো বন্দুক পিস্তল চালাতে জানিস। তোর আব্বার তো বন্দুক আছে, পিস্তল আছে, তুই সেগুলো দিয়ে অনেকবার শিকার করেছিস।

আজাদ বলল, এই জগতে মা ছাড়া আমার কেউ নেই, আর মায়েরও আমি ছাড়া আর কেউ নেই। মা অনুমতি দিলেই কেবল আমি যুদ্ধে যেতে পারি।

মাকে আজাদ বলল, মা, আমি কি যুদ্ধে যেতে পারি?
মা বললেন, নিশ্চয়ই, তোমাকে আমার প্রয়োজনের জন্য মানুষ করিনি, দেশ ও দশের জন্যই তোমাকে মানুষ করা হয়েছে।

আজাদ যুদ্ধে গেল।
দুটো অপারেশনে অংশ নিল। তাদের বাড়িতে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হলো। গেরিলারা আশ্রয় নিল।

১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট। ধরা পড়ে ক্র্যাক প্লাটুনের একদল সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। সেসময় আজাদকেও আটক করা হয়। তাকে ধরে নিয়ে রাখা হলো রমনা থানা সংলগ্ন ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এম.পি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে।

গরাদের ওপারে দাড়িয়ে থাকা আজাদকে তার মা চিনতে পারেন না। প্রচণ্ড মারের চোটে চোখমুখ ফুলে গেছে, ঠোঁট কেটে ঝুলছে, ভুরুর কাছটা কেটে গভীর গর্ত হয়ে গেছে।

–“মা, কি করব? এরা তো খুব মারে। স্বীকার করতে বলে সব। সবার নাম বলতে বলে।“
–“বাবা, তুমি কারোর নাম বলোনি তো?
–না মা, বলি নাই। কিন্তু ভয় লাগে, যদি আরও মারে, যদি বলে দেই…
–বাবারে, যখন মারবে, তুমি শক্ত হয়ে থেকো। সহ্য করো। কারো নাম বলো না।
–আচ্ছা মা। খুব ভাত খেতে ইচ্ছে করে। দুইদিন ভাত খাই না মা। কালকে ভাত দিয়েছিল, আমি ভাগে পাই নাই।
–আচ্ছা, কালকে যখন আসব, তোমার জন্য ভাত নিয়ে আসব।

সাফিয়া বেগমের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গায়ে হাত তোলা তো দূরে থাক, ছেলের গায়ে একটা ফুলের টোকা লাগতে দেননি কোনোদিন। সেই ছেলেকে ওরা এভাবে মেরেছে… এভাবে…

মুরগির মাংস, ভাত, আলুভর্তা আর বেগুনভাজি টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে পরদিন সারারাত রমনা থানায় দাড়িয়ে থাকেন সাফিয়া বেগম, কিন্তু আজাদকে আর দেখতে পাননি। তেজগাঁও থানা, এমপি হোস্টেল, ক্যান্টনমেন্ট-সব জায়গায় খুজলেন, হাতে তখন টিফিন ক্যারিয়ার ধরা, কিন্তু আজাদকে আর খুঁজে পেলেন না।

ছেলে একবেলা ভাত খেতে চেয়েছিলেন। মা পারেননি ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে। সেই কষ্ট-যাতনা থেকে পুরো ১৪টি বছর ভাত মুখে তুলেন নি মা! তিনি অপেক্ষায় ছিলেন ১৪ টা বছর ছেলেকে ভাত খাওয়াবেন বলে। বিশ্বাস ছিলো তাঁর আজাদ ফিরবে। ছেলের অপেক্ষায় শুধু ভাতই নয়, ১৪বছর তিনি কোন বিছানায় শোন নি। শানের মেঝেতে শুয়েছেন শীত গ্রীষ্ম কোন কিছুতেই তিনি পাল্টান নি তার এই পাষাণ শয্যা। আর এর মুল কারণ আজাদ রমনা থানায় আটককালে বিছানা পায়নি।

প্রজন্ম কিংবদন্তি আজাদদের চিনেনা, চিনে হলিউডের অ্যাকশন চলচ্চিত্র।
তাইতো আজো শহীদের মাটিতে পাকিস্তানের প্রতি প্রেম উথলে উঠে বারেবারে।
ভালো থাকুক জীবনের প্রেমগুলো। ভালো থেকো কিংবদন্তী।"